সম্প্রতি কুমিল্লায় নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার করা হয় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের। এ বছর নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে মাটিচাপা অবস্থায়, আবার কারও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে নদী বা ডোবা থেকে।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে গত ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি সাত বছরের এক শিশু। দুই দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর তার সহপাঠীর বাড়ির মেঝের নিচে মাটিচাপা অবস্থায় মরদেহ পাওয়া যায়। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯, ধর্ষণের পর ২৬ এবং ধর্ষণচেষ্টার পর চার শিশু নিহত হয়েছে। ধর্ষণের পর নিহত ২৬ শিশুর মধ্যে দুজন ছিল ছেলে।
এ ছাড়া গুলিতে তিনজন, গৃহকর্মী হিসেবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দুজন এবং উত্ত্যক্তকারীর হাতে দুজন শিশু নিহত হয়েছে। অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে একজনকে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে আসক।
পাবনা সদরে ১০ বছরের একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশুও হত্যার শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিন বোনের মধ্যে সিপার বয়স ছিল ১০ বছর, ইকরার ১৭ এবং সাইমা আক্তারের ২১ বছর।
আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে ১২ বছরের ছেলে আয়ুশকেও হত্যা করা হয়। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তার এক বছর বয়সী সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছরের তিন শিশুকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
শিশু হত্যার পাশাপাশি নিখোঁজের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হলেও তাদের মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৭৯। সে হিসাবে এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।
বাংলাদেশে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে গত ২২ মে বিবৃতি দেয় ইউনিসেফ। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এসব ঘটনায় দায়মুক্তির অবসানের আহ্বান জানান। ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি জায়গায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয় ওই বিবৃতিতে।
শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় পর্যায়ের সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্ব দেয় ইউনিসেফ। একই সঙ্গে স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে সংস্থাটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নৃশংসতা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা আসলে কোথায়—এখন সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। খেলার মাঠে, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, শিশুদের ওপর সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ বা পারিবারিক বিরোধও ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড়দের বিরোধ বা হিংসার শিকার হচ্ছে শিশুরা। এসব ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়তে পারে এবং এ ধরনের অপরাধ কমাতেও তা ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: প্রথম আলো