আবূ হুরাইরা (রাঃ) বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সমাজে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভয়াবহ পাপাচারের কথা উল্লেখ করে বলেছেন—যখন মানুষ আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব ভুলে যাবে, আমানতের জায়গায় লুটের মানসিকতা ঢুকে যাবে; যখন যাকাতকে ইবাদত নয়, বরং বোঝা বলে মনে করা হবে; যখন নৈতিকতাহীন শিক্ষা মানুষের মনকে শূন্য করে দেবে; যখন পরিবারে মা-বাবার মর্যাদা কমে যাবে, আর সমাজে ক্ষমতার আসনে অধঃপতিত চরিত্রের লোক বসবে—তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হবে সতর্কবার্তা, যা কখনও হবে ভূমিকম্প, কখনও অগ্নিবায়ু বা ভূমিধসের মতো ভয়াবহ বিপর্যয়।
এই হাদিসের সবচেয়ে গভীর অংশটি এভাবেই শেষ হয়—যখন পাপ সমাজে স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তখন বিপদও একের পর এক নেমে আসবে, ঠিক এমনভাবে যেমন পুরোনো পুঁতির মালা ছিঁড়ে গেলে তার দানা একটার পর একটা পড়ে যেতে থাকে। অর্থাৎ বিপদ আর থাকবে না বিচ্ছিন্ন; বরং ধারাবাহিক হয়ে উঠবে।
আজকের সমাজে তাকালে কি সেই লক্ষণগুলো চোখে পড়ে না?
অন্যায়, দুর্নীতি, সম্পর্কের অবক্ষয়, অসভ্যতা, মদের প্রসার, আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে যাওয়া—সবই হাদিসে বর্ণিত সতর্কবার্তাকে যেন বাস্তবে দৃশ্যমান করে তোলে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, রাজনীতিতে নৈতিকতা হারিয়ে যাচ্ছে, সমাজে দীনদারির পরিবর্তে ভোগবাদের জয়জয়কার—এসব কি আমরা নিজের চোখে দেখছি না?
কুরআনে আল্লাহ বলেন, “যা কিছু বিপদ তোমাদের ওপর আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মেরই ফল।” (সূরা শূরা, ৪২:৩০)
অর্থাৎ বিপর্যয় আমাদের ধ্বংস করতে আসে না, বরং ফেরার দরজা খুলে দেয়—যাতে আমরা নিজের ভুল চিনতে পারি, তওবার দিকে ফিরে আসতে পারি।
সুতরাং ভূমিকম্প কেবল ভূগর্ভের কম্পন নয়—এটি মানুষের আত্মার কম্পনও হতে পারে।
মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন আল্লাহ তাঁর নিদর্শন দেখান—কখনও পরীক্ষার মাধ্যমে, কখনও সতর্কবার্তা দিয়ে। আর যারা এসব দৃষ্টান্ত দেখে চিন্তা করে, তারাই প্রকৃত মুত্তাকি।
এ কারণেই আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনা, তওবা, পরিপূর্ণ ঈমান এবং নৈতিকতায় ফিরে আসার। সমাজের পরিবর্তন শুরু হবে মানুষের অন্তর থেকেই। এবং আল্লাহর ওয়াদা—যখন বান্দা ফিরে আসে, তখন আল্লাহ রহমত নিয়ে এগিয়ে আসেন।
দুর্যোগের এই সময়ে আমাদের সবার জন্য মূল শিক্ষা—
ভূমিকম্প শুধু মাটি কাঁপায় না, কাঁপিয়ে তোলে অন্তরের ঘুম।
যারা জাগে, তারাই রক্ষা পায়।