বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক ‘মানি মার্কেট ডিনামিকস’ প্রতিবেদনে জুলাইয়ের মুদ্রাবাজারের এ চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, জুলাইয়ে ট্রেজারি বিলের চারটি নিলাম হয়। এসব নিলাম থেকে ৪৪ হাজার কোটি টাকা পায় সরকার। আগের মাসে এ খাত থেকে নেওয়া ঋণের তুলনায় পরিমাণটি ৬ হাজার কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি। তবে একই মাসে ৩৯ হাজার কোটি টাকার ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধ করা হয়। ফলে এ খাতে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
ট্রেজারি বন্ড থেকেও অর্থ সংগ্রহ করেছে সরকার। দুই থেকে ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের তিনটি নিলামে ১২ হাজার কোটি টাকা তোলা হয়। বিপরীতে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করায় বন্ডে নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সরকারের ঋণের পাশাপাশি জুলাইয়ে বিল-বন্ডের ইল্ড বা সুদহারও বেড়েছে। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড মাসের শুরুতে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ থাকলেও ২৬ জুলাই তা বেড়ে ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশে দাঁড়ায়। এই মেয়াদের বিল থেকে মাসে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।
১৮২ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে মাস শেষে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ হয়েছে। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ১০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে পৌঁছায়।
সরকারের ব্যাংকনির্ভরতার পেছনে রাজস্ব আদায় কম হওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। তাদের মতে, ঋণ নিয়ে আগের ঋণ পরিশোধের প্রবণতা চলতে থাকলে সরকারের সুদ ব্যয়ের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিতেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। তবে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। শেষ পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নেয় সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ৩৪ শতাংশের বেশি। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন।
সাবেক অর্থসচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় ধার নেওয়ার প্রয়োজন বাড়ছে। একই সঙ্গে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণের ব্যয়ও বাড়ছে। ব্যয় কমানো এবং রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
এদিকে অর্থ বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণ ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় উঠতে পারে। ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে এই অঙ্ক ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তখন অভ্যন্তরীণ ঋণ ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হতে পারে।
ঋণের সঙ্গে বাড়বে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও। চলতি অর্থবছরে সরকারের সুদ ব্যয়ের প্রাক্কলন ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের হিসাবে, দুই বছর পর এই ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।