ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত দলের নেতাকর্মীদেরও তার সঙ্গে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এরপর মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংগঠিত হওয়ার তৎপরতা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানকে ডিসেম্বরে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিতে দেখা গেছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রের দাবি, গত দুই সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছেন। বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার ও সুনামগঞ্জের ঘটনাগুলো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন ইউনিটকে এ বিষয়ে সতর্ক করে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ময়মনসিংহের গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় যুবলীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ২৭ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পলাতক শীর্ষ নেতাদের যোগাযোগ বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এনক্রিপ্টেড অ্যাপসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে থাকা নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছে বলেও সূত্রের দাবি। সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে তহবিল সংগ্রহের চেষ্টার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা এলাকায় কেউ কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন। ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার কিছু সন্ত্রাসীও এসব এলাকায় অবস্থান করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে অনেকে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কেউ রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেল বা অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ বিউটি পার্লার বা মোটরসাইকেলের ব্যবসা করছেন। কেউ আওয়ামীপন্থি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন। আবার কিছু অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের যেসব নেতার যোগাযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, এনামুল হক শামীম, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, নজরুল ইসলাম বাবু ও পিরোজপুরের মহিউদ্দিন মহারাজের নাম রয়েছে।
সতর্ক থাকার নির্দেশ
বিশ্লেষক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানির পর আওয়ামী লীগের দ্রুত দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়া সহজ হবে না। তাদের ধারণা, কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অংশ হিসেবেই এসব তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তবে নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ক্ষমতায় থাকার সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিলেন। তাদের হাতে অর্থ রয়েছে। সেই অর্থ ব্যবহার করে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হতে পারে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি বা সমর্থন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে হবে। দেশি-বিদেশি কোনো পক্ষের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হলে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
মাঠে আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তার অভিযোগ
পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে বিপুলসংখ্যক কনস্টেবল, এসআই ও এএসপি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো আওয়ামীপন্থি অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তাদের কারও কারও সঙ্গে বিদেশে থাকা সাবেক সরকারের কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত ককটেল, বোমাসদৃশ বস্তু, বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন গোয়েন্দারা। তাদের ধারণা, এসব ঘটনা সম্ভাব্য নাশকতার প্রস্তুতির ইঙ্গিত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে তৃণমূলের কর্মীরা আত্মগোপনে গেলেও তাদের যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের অপরাধপ্রবণ এলাকায় কেউ আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ ছদ্মবেশে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় অবস্থান করছেন। টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বক্তব্য ও বার্তা ছড়িয়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে বলেও সূত্রের দাবি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে পড়বে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাও বেড়েছে। জনগণের সহযোগিতা থাকলে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করা সম্ভব।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নিয়মিত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোনো মহল বিশেষ উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সূত্র: যুগান্তর