ঘটনার দিন বিজিবির সদস্যদের একটি কনভয় পিকআপ ট্রাক ও কয়েকটি বাসে করে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। দুপুরের দিকে প্রায় ৮০ জন বিজিবি সদস্য বহনকারী দুটি বাস ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মুলাইদ এলাকার বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশনের কাছে পৌঁছালে একদল লোক তাদের পথরোধ করে।
অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা বিজিবির বাসে থাকা সদস্যদের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ অথবা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং ‘র’-এর সদস্য বলে সন্দেহ করে। তারা বিজিবির পোশাক পরা সদস্যদের ভারতীয় নাগরিক দাবি করে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ায়। এমনকি বাসের যাত্রীরা হিন্দিতে কথা বলছেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়।
এ ঘটনায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিজিবির গাড়ি ঘেরাও, গুলিতে নিহত ৬’। প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হতাহতের তথ্য উঠে আসে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিজিবি সদস্যরা নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করতে একাধিকবার সরকারি পরিচয়পত্র দেখালেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে দাবি করা হয়।
বিকেলজুড়ে কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় বিজিবির ১১টি যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলাকারীদের প্রহারে বিজিবির নায়েক মো. আব্দুল আলিম শেখ নিহত হন এবং আরও ১০ জন বিজিবি সদস্য গুরুতর আহত হন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। পরে সন্ধ্যা ৮টার পর সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটকে পড়া বিজিবি সদস্যদের উদ্ধার করে।
ঘটনার সময় সংঘর্ষে আটজন হামলাকারী নিহত এবং ৫০ জনের বেশি ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওই সংঘর্ষে নিহত আটজনের নাম জুলাই শহিদ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
গেজেটে উল্লেখিত নামগুলো হলো—
১. সিরিয়াল ১৩৫ — আসির ইন্তিশারুল হক
২. সিরিয়াল ২৭৫ — মাসুম বিল্লাহ
৩. সিরিয়াল ৪৪৫ — শিফাত উল্লাহ
৪. সিরিয়াল ৪৫২ — শরিফুল ইসলাম
৫. সিরিয়াল ৪৮২ — জাকির হোসেন রানা
৬. সিরিয়াল ৫০১ — কাওসার মিয়া
৭. সিরিয়াল ৫৩৭ — জুয়েল মিয়া
৮. সিরিয়াল ৭২২ — রহমত মিয়া
নিহতদের স্বজনদের করা মামলাগুলো

পরবর্তী সময়ে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত কয়েকজনের স্বজনদের পক্ষ থেকে পৃথক হত্যা মামলা দায়েরের তথ্যও পাওয়া যায়। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাহফুজ হত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকসহ ৩৪ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং অজ্ঞাতনামা ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে আসামি করা হয়।
গেজেটের ৫১২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা ইলিম হোসেনকে সহযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে উপজেলার হরিণহাটি এলাকার সেকান্দার আলীর ছেলে আবু সাইদ (রাজু) বাদী হয়ে ২৭ জুলাই কালিয়াকৈর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪২ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে আসামি করা হয়।
এ ছাড়া গেজেটের ৫৭৫ নম্বর সিরিয়ালে থাকা মোস্তফার বাবা স্বপন মিয়া ২৮ নভেম্বর গাজীপুর আদালতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাকির হোসেন রানার বাবা জামাল উদ্দিনের দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ৩৫ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং আরও ৪০০ থেকে ৫০০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট বিকেল ৪টার দিকে নামীয় আসামিদের নির্দেশে বিজিবি সদস্যরা ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালান।
অন্যদিকে রহমত মিয়ার বাবা মো. মুনজু মিয়া দায়ের করা মামলায় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, ৬০ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং ৫০০ থেকে ৬০০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিক্ষোভকারীরা বিজিবির অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।
এ ছাড়া শিফাত উল্লাহর বাবা, মাসুম বিল্লাহর মা, আসির ইন্তিশারুল হকের বাবা এবং জুয়েল মিয়ার স্ত্রীসহ অন্যান্য স্বজনরাও বিভিন্ন সময়ে পৃথক হত্যা মামলা করেন। এসব মামলায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের এবং বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ৫ আগস্ট বিকেলের পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষা, নাগরিকদের জানমাল ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং সহিংস জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে আইনানুগভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের যথেষ্ট আইনি ভিত্তি ছিল। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও বিজিবি, আনসার ও পুলিশ সদস্যদের রক্ষায় গুলি চালিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
গেজেট নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই শহিদ গেজেটের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। অভিযোগ রয়েছে, তালিকার কিছু এন্ট্রিতে ঠিকানা অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছে, ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, গেজেটের সিরিয়াল ২৯৩-এ ‘রুস্তম মিয়া’র নাম ‘রুখতান মিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে সিরিয়াল ৪৮২-এ থাকা জাকির হোসেন রানার ঠিকানাও অসম্পূর্ণ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় মূল প্রশ্ন উঠছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের কী প্রক্রিয়ায় জুলাই শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল।
যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কেউ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ছিলেন এবং সেই সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন, তাহলে তাকে শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ভিত্তি কী ছিল—এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সমালোচকরা। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের ওই সংঘর্ষে নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা, মৃত্যুর কারণ এবং গেজেটে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে যাচাই করার দাবিও উঠছে।