গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশকে ঘিরে সংঘর্ষে প্রাণ হারান দীপ্ত সাহা, রমজান কাজী, ইমন তালুকদার, সোহেল মোল্লা ও রমজান মুন্সী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চার সদস্যের অনুসন্ধান দল নিহত ও আহতদের পরিবার, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, পেশাজীবী, হাসপাতাল ও কারাগার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে আসক বলেছে, এই সহিংসতায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। নাগরিকদের সভা-সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে, এবং পরবর্তী সময়ে গণগ্রেপ্তার ও হয়রানিমূলক আচরণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাবেশের আগের দিন প্রশাসন সমাবেশস্থলের আশপাশের দোকানপাট বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়। ১৬ জুলাই সকালে দোকানদারদের জোর করে দোকানের ভেতরে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। সকাল থেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয়।
সমাবেশ শুরুর কিছুক্ষণ পর এনসিপি নেতারা কিছু উস্কানিমূলক বক্তব্য দিলে উত্তেজনা চরমে ওঠে। এরপর শুরু হয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, দেশীয় অস্ত্রের আঘাত, এবং তিন ঘণ্টাব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। তবে হামলাকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি বলেও জানিয়েছে আসক। নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
পাঁচ নিহতের মধ্যে শুধুমাত্র রমজান মুন্সীর ময়নাতদন্ত করা হয়। বাকি চারজনের মরদেহ পরিবারের অনুমতি ছাড়াই হাসপাতাল থেকে তাড়াহুড়ো করে দাফন বা সৎকারে বাধ্য করা হয়। পরে সংবাদ প্রকাশ হলে প্রশাসন ২১ জুলাই কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করে, যা পরিবারগুলোর জন্য নতুন এক ধরনের হয়রানি বলেই মনে করছে আসক।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৮ শিশুকে গ্রেপ্তার করে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, এই শিশুদের সঙ্গে সংঘর্ষের কোনো যোগসূত্র নেই। আতঙ্কে বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
১৬ জুলাইয়ের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত ৮টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ছয়টির কপি আসকের হাতে এসেছে। মামলাগুলোতে ৫৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫৮ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন নারী ও ৩২ জন হিন্দু সংখ্যালঘু রয়েছেন। কিছু মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনও প্রয়োগ করা হয়েছে।
পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ বলেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি ছোড়া হয়েছে, তবে তারা ‘মারণাস্ত্র’ ব্যবহার করেনি। কারাগারে হামলা ঠেকাতে ৮০ রাউন্ড মিসফায়ার করা হয় বলে দাবি করেছে তারা। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে ৫৪ ধারায় আটক দেখানো হয়েছে।
আসকের প্রতিনিধিরা তথ্য সংগ্রহের সময় গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসির অসৌজন্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হন। এছাড়া নিহতদের পরিবারের সঙ্গে মামলা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়নি বলে আসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।