জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। এ সময় ফেরারি আসামি হয়েও দেশে ফিরে আসেন মোঘল। অভিযোগ রয়েছে, দেশে ফিরে তিনি বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষ্য, মোঘলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কর্মীরা এলাকায় পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে বিএনপির সমর্থকদের অনেকে ঘরছাড়া হয়েছেন। বাড়িঘর দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদা আদায়—এসব অভিযোগও উঠেছে। কেউ কেউ নিয়মিত চাঁদা দিয়ে এলাকায় থাকতে বাধ্য হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, মোঘলের পারিবারিক পটভূমি ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তার বাবা হারুন অর রশীদ শরণার্থী হিসেবে দেশে এসে একটি জুট মিলে কেরানির চাকরি নেন। একসময় পরিবারটি দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটালেও পরবর্তীতে মোঘল বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। কাঞ্চন পৌর এলাকায় তার বাহিনীর কাছে অবৈধ অস্ত্রের বড় ভাণ্ডার রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশি-বিদেশি পিস্তল, শটগান, দা-ছুরিসহ বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে।
রূপগঞ্জ থানা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। গত বছরের ৪ এপ্রিল প্রতারণার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ আদালতে দুটি সিআর মামলা হয়, যা এখনো তদন্তাধীন। এছাড়া ২০২৩ সালে রূপগঞ্জ থানায় হত্যাচেষ্টার একটি মামলা (মামলা নং-৩১৬) দায়ের হয়। তার বিরুদ্ধে বাছির হত্যা মামলা, বাদশা মেয়রকে হত্যাচেষ্টা এবং আবুল বাশার মেয়রকে মারধরের অভিযোগেও মামলা রয়েছে। ২০০৯ সালে মারামারির অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা (মামলা নং-৩৯) হয়।
স্থানীয়দের মতে, কাঞ্চন পৌর এলাকা ও কেন্দুয়ার অনেক বাসিন্দা তার প্রভাবের কারণে আতঙ্কে থাকেন। অনেকে ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। অভিযোগ রয়েছে, নানা কৌশলে তিনি স্থায়ী জামিন নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, মোঘলের বিদেশে একাধিক দেশের গোল্ডেন ভিসা রয়েছে—যার মধ্যে দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা উল্লেখযোগ্য। দুবাইয়ে ১০ বছরের গোল্ডেন ভিসা এবং থাইল্যান্ডে দীর্ঘমেয়াদি মাল্টিপল ভিসা থাকার কারণে পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত দেশ ছাড়তে পারেন তিনি। তার বিরুদ্ধে অর্থপাচার, বিদেশে ক্যাসিনোতে জড়িত থাকা এবং অবৈধ অর্থে বিলাসবহুল জীবনযাপনের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র বলছে, গত দেড় বছরে বিদেশের বিভিন্ন ক্যাসিনোতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হারিয়েছেন মোঘল। এই অর্থের বড় অংশই রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, জমি দখল ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে গেলে তার জন্য পাঁচতারকা হোটেলে থাকা-খাওয়া ও বিনোদনের বিশেষ ব্যবস্থা থাকে বলেও জানা গেছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বিদেশে অবস্থানকালে তার সঙ্গে পলাতক অন্যান্য শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। মিরপুরের কুখ্যাত জুয়াড়ি মনির ওরফে ‘আমেরিকান মনির’ এবং সোহেল খানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে জানা গেছে। অনেক সময় দেশে অবস্থান করেও ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিদেশি ক্যাসিনোতে অংশ নেন তিনি। বিদেশে যাওয়ার আগে হুন্ডির মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত পাচারের অভিযোগও রয়েছে। কামরুল নামে এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে এসব লেনদেন পরিচালিত হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দুদক ও সিআইডি যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে, তাহলে এসব অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসবে। তবে এখনো কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে