বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটির আবেদন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা ও জাতীয় ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারজুক আব্দুল্লাহ। আদালত অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সক্রিয় সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত অস্ত্র ও অর্থের জোগান দেওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, ভাঙচুর, বিস্ফোরণ, হামলা ও হত্যাচেষ্টার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন। এজাহারে আরও দাবি করা হয়, গত ১০ জুন বিকেলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে রামদা, চাপাতি, লোহার রড, হকিস্টিক, পাইপগান, মর্টারগান, বন্দুক, ককটেল ও হাতবোমা নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। পরে টায়ারে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয় এবং আগুন নেভাতে গেলে হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ আনা হয়েছে ১৬ জুন নগরীর ভাঙারপোল এবং ২২ জুন কাশীপুর মৃত্তিকা অফিসসংলগ্ন এলাকাতেও।
তবে মামলার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, চারজন প্রয়াত নেতার বিরুদ্ধেও এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর রহমান ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি মারা যান। কিন্তু এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি গত ১০ জুন গড়িয়ারপাড় এলাকায় মিছিলে অংশ নিয়ে হাতবোমা নিক্ষেপ করেন। একইভাবে ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ মারা যাওয়া আবুল ফারুক, ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর মারা যাওয়া হাফিজুর রশিদ এবং ২০২১ সালের ২৬ জুলাই মারা যাওয়া আলী হাওলাদারের বিরুদ্ধেও ওই দিনের মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণে অংশ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর, সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ এবং বরিশাল সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টুসহ আরও অনেকে।
মামলায় মৃত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন বরিশাল সিটির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও ছাত্রলীগের বরিশাল জেলা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব হোসেন খান। তিনি বলেন, মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের চারজনের জানাজায় তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন। তাই যারা বহু আগে মারা গেছেন, তারা কবর থেকে উঠে এসে ককটেল ছুড়েছেন—এমন অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে মামলার বাদী মারজুক আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, খন্দকার রেজাউরের নাম সাক্ষীদের দেওয়া ভুল তথ্যের কারণে এজাহারে এসেছে। অন্য তিনজনের বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে পারেননি।
মৃত ব্যক্তিদের আসামি করায় বিষয়টি নিয়ে আইন ও সুশাসন সংশ্লিষ্ট মহলেও প্রশ্ন উঠেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের নগর সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, বিষয়টি আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার শামিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তদন্তে প্রকৃত তথ্য উঠে আসবে এবং নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার হবেন না।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া আইনজীবী আবু আল রায়হান (রুদ্রাক্ষ রায়হান) বলেন, মৃত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করলে সেটি শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তিনি জানান, ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ২০৯ ও ২১১ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশে পুরো ঘটনার তদন্ত করা হবে। মামলায় উল্লেখ করা সময় ও ঘটনাগুলো বাস্তবে ঘটেছে কি না, তা যাচাই করা হবে। তদন্তে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে তালিকাভুক্ত কোনো আসামি ঘটনার আগেই মারা গেছেন, তাহলে সেই তথ্যই আদালতে প্রতিবেদন আকারে জমা দেওয়া হবে।
সূত্র: এশিয়া পোস্ট