বুধবার (২২ জুলাই) প্রকাশিত সিআইডির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব স্বাক্ষরিত ওই তথ্য জানানো হয়।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি ওই অর্থ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়। এর ভিত্তিতে বনানী থানায় মামলা নম্বর ২৭, তারিখ ২১/০৭/২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধনী-২০১৫)-এর ৪(২)/৪(৪) ধারায় মামলাটি করা হয়।
মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান (৬১), চেয়ারম্যান তানিয়া সুলতানা তানভী (৪৯) এবং একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মোমেন (৬৫)। সিআইডি জানিয়েছে, তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড, বেস্টওয়ে ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, গ্রেট ওয়াল ল্যান্ড প্রোপার্টি লিমিটেড, বেস্টওয়ে পাওয়ারটেক লিমিটেড, বেস্টওয়ে ফাউন্ডেশন লিমিটেড, বেস্টওয়ে কো-অপারেটিভ কমার্শিয়াল ক্রেডিট লিমিটেড, নভেল্টা বেস্টওয়ে ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, বেস্টওয়ে মোটরস লিমিটেড, বেস্টওয়ে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনকিউবেশন লিমিটেড, বেস্টওয়ে ন্যাশনওয়াইড হাউজিং লিমিটেড, এনআরবি টাউন লিমিটেড, বেস্টওয়ে এগ্রো লিমিটেড, বেস্টওয়ে টাইমস সিটি লিমিটেড, বেস্টওয়ে জেমি ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড, গ্লোবাল কানেক্ট বিডি লিমিটেড, হেরিটেজ হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড এবং বেস্টওয়ে মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন লিমিটেড।
সিআইডির অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রূপগঞ্জ থানার ভোলাব, তরাইল, বিরাব, মোচারতালুকসহ বিভিন্ন মৌজায় জমি প্লট আকারে কিস্তিতে বিক্রির প্রচারণা চালায় বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্লট দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নির্ধারিত মূল্যে তাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে বলা হয়, অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর কিস্তি ও নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করেও প্রতিশ্রুত প্লট পাননি। একই সঙ্গে জমা দেওয়া অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্লট বরাদ্দের নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের বিপরীতে জিম্মা, গ্যারান্টি বা সিকিউরিটি হিসেবে সাব-কবলা দলিল দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিশ্রুত প্লট বরাদ্দ করা হয়নি।
প্লট না পাওয়া এবং অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজন গ্রাহক সিআইডিতে অভিযোগ করলে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। সিআইডির দাবি, দীর্ঘ অনুসন্ধান ও নথিপত্র পর্যালোচনায় অন্তত ৩৭ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে মোট ৭ কোটি ২ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৪ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তাদের প্রতিশ্রুত প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এবং গ্রহণ করা অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি।
সিআইডি আরও জানায়, গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের একটি বড় অংশ অভিযুক্তদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে জমা, উত্তোলন, স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ৮২টি ব্যাংক হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনা করে ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে এসব ব্যাংক হিসাবে মোট ৩৫৯ কোটি ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৫ টাকা ৭২ পয়সা জমা এবং ৩৫৮ কোটি ৫৪ লাখ ৩৭ হাজার ১০২ টাকা ৭৯ পয়সা উত্তোলন করা হয়েছে। এসব অর্থ বিভিন্নভাবে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের তথ্যও পেয়েছে সিআইডি।
এ ছাড়া ২০১০ সালে ১ হাজার ১৮৮টি, ২০১১ সালে ৯৫৩টি, ২০১২ সালে ২৭৪টি, ২০১৩ সালে ১৯৬টি এবং ২০১৪ সালে ১০২টিসহ মোট ২ হাজার ৭১৩টি জিম্মা, গ্যারান্টি বা সিকিউরিটি হিসেবে দেওয়া সাব-কবলা রেজিস্ট্রি দলিলের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। এসব নথি ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে প্রতারণার মাধ্যমে পাওয়া অর্থ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে স্থানান্তর ও রূপান্তরের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের তথ্য পাওয়ায় বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তি ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী-২০১৫)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
মামলাটির তদন্ত বর্তমানে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে চলছে। তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা, প্রতারণার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, অর্থের উৎস ও গন্তব্য এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর ও রূপান্তরের বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় আরও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কি না, পাশাপাশি প্রতারণার শিকার অন্যান্য গ্রাহক ও তাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে কোনো আবাসন প্রকল্পে প্লট বা ফ্ল্যাট কেনার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন, ভূমির কাগজপত্র ও অর্থ লেনদেনের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে অর্থ না দেওয়ার জন্যও জনগণের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতারণা, অবৈধ অর্থ লেনদেন বা মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত তথ্য জানা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।