পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একাংশ বলছেন, কোথায়, কখন এবং কারা মিছিল করবে—এ ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য অনেক সময় আগে থেকে তাদের কাছে থাকে না। ফলে আগাম পুলিশ মোতায়েনের পরিবর্তে ঘটনার পর ঘটনাস্থলে যেতে হচ্ছে। সম্প্রতি গুলশানের ডিসি ও ওসিকে প্রত্যাহারের পর এ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকার অনেক কর্মকর্তা অন্য ইউনিটে বদলির সুযোগ খুঁজছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের পর ডিসি ও ওসিকে প্রত্যাহারের ঘটনায় মাঠপুলিশের মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঝটিকা মিছিল ও নাশকতা এক ধরনের ঘটনা নয়। তবে দুটির ক্ষেত্রেই দ্রুত ও নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় কর্মসূচির সম্ভাবনার সাধারণ তথ্য থাকলেও নির্দিষ্ট স্থান, সময় ও অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে তথ্য না থাকলে আগে থেকে পুলিশ মোতায়েন, চেকপোস্ট বসানো বা নজরদারি বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমপির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ককটেল বিস্ফোরণ বা ঝটিকা মিছিলের মতো ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে যেতে পারে। সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া পুরো শহরে আগাম পুলিশ অবস্থান করানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে জুমার নামাজের সময় বিপুল মানুষের ভিড়ে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করাও কঠিন। ১৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নাকি সমন্বিত ছিল, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি টহল দল নির্ধারিত এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। টহলরত অবস্থায় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়ার পথে কোথাও হঠাৎ মিছিল শুরু হলে সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে। অথচ পরে মাঠের এসআই-এএসআইদেরই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়। তাদের প্রশ্ন, থানা এলাকায় মিছিল হওয়ার তথ্য যদি থানা সিটিএসবির কাছেই না থাকে, তাহলে শুধু টহল পুলিশকে কেন দায় নিতে হবে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডিএমপি, আরএমপি, জিএমপি, বিএমপি ও সিএমপিসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, ঝটিকা মিছিলের কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। কর্মীরা মিছিলের কিছুক্ষণ আগে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে আশপাশের ভাসমান দোকান বা মানুষের জমায়েতের জায়গায় অবস্থান নেন। এরপর পুলিশের টহল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন। সুযোগ বুঝে পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মিছিল করে দ্রুত সরে যান তারা। এ কারণে প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থায় আগে থেকে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকাতেও সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে এমন মিছিলের খবর পাওয়া গেছে। চলতি বছরের ১৫ আগস্টকে ঘিরে ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় রাতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মশাল ও ঝটিকা মিছিলের খবর আসে। পরে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে আটক করে পুলিশ।
২৭ আগস্ট আনোয়ারার কালাবিবির দীঘি এলাকায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার নেতৃত্বে ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়া যায়। পরদিন ২৮ আগস্ট সকাল ৭টার দিকে নগরীর অনন্যা আবাসিক এলাকা ও অক্সিজেন-কুয়াইশ সংযোগ সড়কে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি মিছিল হয়। ১১ সেপ্টেম্বর হাটহাজারীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ১২ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ব্যানারে আরেকটি মিছিল হয়, যার ৩৪ সেকেন্ডের ভিডিওও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ায়।
১৮ সেপ্টেম্বর নগরীর পাঁচলাইশে পিডিবি অফিস এলাকায় ঝটিকা মিছিল হয়। একই রাতে কোতোয়ালি থানার রেডিসন ব্লু-কাজীর দেউড়ি এলাকাতেও মিছিলের খবর পাওয়া যায়। সে সময় রেডিসন ব্লুতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন কোতোয়ালি থানার ওসি জায়েদ। ১৯ সেপ্টেম্বর কাজীর দেউড়িতে আবারও মিছিলের খবর আসে। একই রাতে বাকলিয়া থানার কালামিয়া বাজার এলাকায় দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশ ঘটনাটিকে গুজব বলে দাবি করেছে।
রাজধানীর গুলশানে ১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের কয়েকশ নেতাকর্মী জড়ো হয়ে মিছিল করেন। ঘটনাটি গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিছিলটির বিষয়ে আগে থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে ছিল না। এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ ও গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এর পর থেকেই মাঠ পুলিশের মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলেন, ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণে কর্মকর্তাদের বদলি বা বরখাস্তসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে কেউ কেউ ডিবি, সিটিএসবি, এসবি ও এপিবিএনে বদলির চেষ্টা করছেন। এমনকি থানা বা ফাঁড়ি থেকে অন্য স্টেশনে বদলির আদেশ হলেও অনেকে থানা-ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকতে চাইছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দ্রুত সংগঠিত হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে স্থান বদলের কৌশল মোকাবিলায় মাঠপুলিশ ও গোয়েন্দা—দুই পক্ষকেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় শুধু মাঠপর্যায়ের পুলিশকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মাঠ গোয়েন্দা ইউনিট থেকে সদর দপ্তর এবং সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য পৌঁছানোর পুরো ব্যবস্থায় সমন্বয় ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সাধারণত সম্ভাব্য কর্মসূচি বা ঝুঁকির তথ্য মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা ইউনিটগুলো প্রতিবেদন ও বার্তার মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পাঠায়। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মোতায়েন, নজরদারি, চেকপোস্ট বা টহল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে তথ্য দেরিতে পৌঁছালে কিংবা পর্যাপ্ত সুনির্দিষ্ট না হলে আগাম প্রতিরোধের সুযোগ কমে যায়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, মাঠে পুলিশ ও গোয়েন্দারা সক্রিয় রয়েছেন। গোয়েন্দা সদস্যরা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করছেন। তবে যারা মিছিল সংগঠিত করছে, তারাও কৌশল পরিবর্তন করছে। ফলে নির্দিষ্ট স্থান সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না।
রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে আগাম তথ্য না পাওয়ার কারণ জানতে ডিএমপিসহ কয়েকটি মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স উইংয়ের এআইজি এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত যেকোনো দলের অপতৎপরতা ঠেকাতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কোনো ঘটনায় গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল কি না, তা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজি বলেন, ঝটিকা মিছিল প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা প্রয়োজন। তবে কোনো ঘটনার আগাম তথ্য সংশ্লিষ্ট থানা বা ইউনিটের কাছেই না থাকলে শুধু ওসি-ডিসিকে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং সময়মতো মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও দেখা দরকার। তার মতে, সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলে ঝটিকা মিছিলের সময়, স্থান ও অংশগ্রহণকারীদের আগেই শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া মাঠপুলিশের জন্য কঠিন।
এদিকে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। তাদের ধারণা, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দিতে ঝটিকা মিছিলকে কৌশল হিসেবে নেওয়া হয়েছে। পলাতক জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে মাঠকর্মীদের যোগাযোগ বাড়ছে এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দেশনা আদান-প্রদান হচ্ছে বলেও সূত্রের দাবি।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের একটি আলোচিত ভিডিওতে ডিসেম্বরে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনার বিষয়টিও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসেছে বলে জানা গেছে। তবে সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলের সঙ্গে বড় ধরনের নাশকতার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কিংবা ১৮ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের ঘটনার সঙ্গে ডিসেম্বরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতার সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ।