অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এমন এক অবস্থা, যেখানে শরীরের জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে এসব ওষুধ আর সংক্রমণ ঠেকাতে পারে না। একসময় যেসব অ্যান্টিবায়োটিক এক ডোজেই রোগ সারিয়ে তুলত, এখন সেগুলোও কাজ করছে না বহু রোগীর শরীরে। চিকিৎসা জগতে একে বলা হচ্ছে ‘পোস্ট-অ্যান্টিবায়োটিক যুগের সূচনা’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এটিকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকির শীর্ষে রেখেছে।
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের চিত্র অনেকটাই উদ্বেগজনক। দেশের শহর ও গ্রামে ওষুধের দোকানগুলোতে সহজেই প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। ঠান্ডা-জ্বর বা সামান্য ইনফেকশনেই মানুষ নিজের মতো করে ওষুধ খেয়ে নিচ্ছে। আবার অনেকেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলেও কোর্স শেষ না করেই বন্ধ করে দিচ্ছেন। এতে শরীরে জীবাণুরা পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে—এবং ভবিষ্যতে ওষুধকে নিরর্থক করে দিচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে এমন গাফিলতি ও ভুল সিদ্ধান্ত এক সময় পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই প্রবণতা বন্ধ না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সজনিত কারণে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে স্বাস্থ্যসেবার পরিসর সীমিত, সেখানে এই রকম প্রতিরোধী সংক্রমণ ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
রোগীদের অজ্ঞতা এবং ওষুধ ব্যবসায়ীদের উদাসীনতার পাশাপাশি পশুপালন ও কৃষিতেও অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনেক খামারে মুরগি বা গরুকে দ্রুত সুস্থ করার জন্য অথবা ওজন বাড়াতে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। এই প্রাণীরা যখন মানুষের খাদ্যচক্রে আসে, তখন পরোক্ষভাবেও প্রতিরোধী জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করে। একইভাবে মাছচাষ ও সবজির ক্ষেতেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে এখনই প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা। প্রথমত, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, একটি কোর্স শুরু করলে তা সম্পূর্ণ করতে হবে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত। সরকারকে কঠোরভাবে ওষুধ বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে—যাতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না হয়। একইসঙ্গে পশুখাদ্য ও কৃষিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগ জরুরি।
অ্যান্টিবায়োটিক একসময় মানবজাতির জন্য ছিল চিকিৎসার এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। কিন্তু সেই আশীর্বাদ আজ অবহেলা আর অপব্যবহারে ভয়াবহ অভিশাপে রূপ নিচ্ছে। এখনই যদি সতর্ক না হওয়া যায়, তাহলে এমন একটি বাস্তবতা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে, যেখানে সাধারণ সর্দি-জ্বরও হয়ে উঠবে মৃত্যুর কারণ। অ্যান্টিবায়োটিকের জ্ঞান ও ব্যবহার যতদিন না ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় স্তরে দায়িত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, ততদিন এ বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়।