আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় নতুন সরকার। গত ২৭ মে সরকারটির ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে।
এই সময়ে বিভিন্ন খাতে সরকারের নানা উদ্যোগ ইতিবাচক আলোচনায় এলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। প্রথম ১০০ দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাসের পর মাস হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত প্রকাশিত ‘হত্যাকাণ্ড’, ‘খুন’, ‘হত্যা’, ‘ধর্ষণের পর হত্যা’ এবং ‘ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা’ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এশিয়া পোস্ট। আত্মহত্যা ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা বাদ দিয়ে বিশ্লেষণে ২২৯টি হত্যাকাণ্ডে অন্তত ২৪৯ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে হত্যার ধরন, ভুক্তভোগীদের বয়স এবং বিভাগভিত্তিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
খুনের শিকারদের বড় অংশ তরুণ ও শিশু
১০০ দিনে নিহত ২৪৯ জনের মধ্যে ৫১ জনের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ মোট নিহতদের ২০ শতাংশেরও বেশি শিশু ও কিশোর।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহতদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। ২ মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত মোট ১১৫ জন হত্যার শিকার হয়েছেন, যা মোট ভুক্তভোগীর প্রায় ৪৬ শতাংশ।
মাস বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে হত্যাকাণ্ড
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে হত্যার ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ দিনে ১৩টি ঘটনায় নিহত হন ১৪ জন। মার্চ মাসে ৪২টি ঘটনায় প্রাণ হারান ৪৩ জন।
এপ্রিল মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩টিতে। সে মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি হত্যার ঘটনা ঘটে। মাসের শেষ দিকে কয়েকটি ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। ২০ এপ্রিল রাতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এক নারী ও তার নবজাতকের গলিত মরদেহ মাটিচাপা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরদিন সকালে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় তিন বছরের শিশুসহ একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
সময়ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের প্রচলিত পদ্ধতি ‘টেম্পোরাল ফেজিং’ অনুযায়ী পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফেব্রুয়ারির শেষাংশ থেকে শুরু করে পরবর্তী মাসগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। শুধু মে মাসের প্রথম ২৭ দিনেই ৯৮টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং নিহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে।
ঢাকাতেই সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০০ দিনে দেশের আট বিভাগের মধ্যে ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ অঞ্চলে ৮৫টির বেশি ঘটনায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যা মোট হত্যাকাণ্ডের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
নরসিংদীতে ধর্ষণের পর এক কিশোরীকে হত্যা, গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা এবং রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা—এসব ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে।
ঢাকা ও আশপাশের জেলা—নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জে হত্যার হার সবচেয়ে বেশি ছিল।
হত্যাকাণ্ডের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। এ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় অর্ধশতাধিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা মোট ঘটনার ২২ শতাংশের বেশি।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে রংপুর ও বরিশাল বিভাগে। এই দুই বিভাগে ১০০ দিনে ৯টি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ৪ শতাংশ করে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ১১টি এবং সিলেট বিভাগে ১৩টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। জাতীয় হিসাবে দুই বিভাগের অংশ প্রায় ৫ শতাংশ করে।
একই সময়ে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে ২৫টি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দুই বিভাগের হারই মোট ঘটনার প্রায় ১০ শতাংশ।
ধর্ষণ, মাদক ও পরকীয়া নিয়ে সংঘাতে নিহত ৫৭ জন
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ২২টি ঘটনায় ধর্ষণের আগে বা পরে ভুক্তভোগীকে হত্যা করা হয়েছে।
মাদকসংশ্লিষ্ট কারণে ২৩টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে মাদক কারবার নিয়ে বিরোধ কিংবা মাদকাসক্ত অবস্থায় হত্যার ঘটনা রয়েছে।
এ ছাড়া ১২টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কজনিত বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে।
গত ১০০ দিনে নিহতদের মধ্যে ৯৩ জন ছিলেন নারী ও ৮ বছরের কম বয়সী শিশু। অর্থাৎ মোট নিহতদের প্রায় ৩৭ শতাংশই নারী ও অল্পবয়সী শিশু।
সূত্র: এশিয়া পোস্ট