শিশুদের জন্য টিকার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, এটি এমনসব রোগ থেকে রক্ষা করে যেগুলোর কারণে মৃত্যু কিংবা স্থায়ী অক্ষমতা পর্যন্ত হতে পারে। হাম, পোলিও, হেপাটাইটিস-বি, টিটেনাস, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, রুবেলা, টাইফয়েড ইত্যাদি রোগের প্রতিরোধ গঠনে টিকা কার্যকর ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত একটি পদ্ধতি। সময়মতো টিকা গ্রহণ করলে এসব রোগের সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হয় এবং শিশুরা সুস্থভাবে বড় হয়ে উঠতে পারে।
টিকা শুধু একটি শিশুকেই নয়, তার চারপাশের সমাজকেও সুরক্ষিত রাখে। যেসব শিশুরা কোনো কারণে টিকা নিতে পারে না—যেমন দুর্বল ইমিউন সিস্টেম বা জটিল শারীরিক অবস্থা—তাদের প্রতিরক্ষা দেয় আশপাশের টিকাপ্রাপ্ত শিশুরা। এটিই হলো গোষ্ঠীগত প্রতিরোধ বা হার্ড ইমিউনিটি। সমাজে যত বেশি শিশু টিকাপ্রাপ্ত হবে, পুরো সমাজ ততটা নিরাপদ থাকবে।
এছাড়াও টিকা দীর্ঘমেয়াদে পরিবার ও রাষ্ট্রের আর্থিক খরচও কমিয়ে আনে। টিকা নেওয়া শিশুরা কম অসুস্থ হয়, কম হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং চিকিৎসা বাবদ ব্যয় অনেকাংশে হ্রাস পায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ২৬ টাকার সমপরিমাণ খরচ সাশ্রয় হয়, যা স্বাস্থ্যনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত ইতিবাচক।
শিশুর জন্মের সময় থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত কিছু নির্ধারিত টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন, জন্মের সময় দেওয়া হয় BCG (যক্ষা), OPV (পোলিও) ও হেপাটাইটিস-বি। এরপর ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে দেওয়া হয় Pentavalent টিকা যা একাধিক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ৯ মাসে দেওয়া হয় হাম ও রুবেলার (MR) টিকা, ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ এবং প্রয়োজনে ২ বছর বয়সে টাইফয়েড টিকা। এছাড়া ৯–১৪ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়েদের জন্য রয়েছে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর HPV টিকা।
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে টিকার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে হাম বা মিজলস রোগ আবার ফিরে আসছে। যুক্তরাজ্যের কিছু হাসপাতালে টিকা না নেওয়ায় শিশুদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও ২০২৫ সালের মধ্যে মিজলস আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও জোরদার ও সচেতনতামূলক করা জরুরি।
দুঃখজনকভাবে অনেকেই এখনও টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা বা ভয় পোষণ করেন। অনেকে মনে করেন টিকা দিলে শিশুর শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে কিংবা টিকা অটিজমের কারণ হয়—যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বৈজ্ঞানিকভাবে খণ্ডন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যদি হয়ও, তা খুবই হালকা, যেমন—ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা, অল্প জ্বর ইত্যাদি। এসব সাধারণ বিষয় এবং গুজব থেকে সচেতন থাকতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, প্রতিটি শিশুর জন্য টিকা নেওয়া একটি মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার। একটি টিকা শুধু একটি শিশুর জীবনই রক্ষা করে না, তা সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখে। বাবা-মা ও অভিভাবকদের উচিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে টিকা দেওয়া, টিকাদান কার্ড সংরক্ষণ করা এবং টিকার বিষয়ে সচেতন থাকা। টিকা হল সুস্থ ভবিষ্যতের ভিত্তি—এ বিষয়ে কোনো শিথিলতা নয়।