২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর সৌদি আরব যাওয়ার সময় বিমানবন্দরের ছবি দিয়ে ‘গুড বাই বাংলাদেশ’ লিখে সবার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন মাহিন। পরে আরেক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘ভাব নেয়াটা আমাকে মানায় নাহ, কারণ আমি মধ্যবিত্ত।’ ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লেখেন, ‘পকেটে টাকা থাকলে তোমরা দুনিয়া কিনতে পারবে।’
পরে মক্কার মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পান তিনি। ওই বছরের ৮ মার্চ কাবা শরিফের সামনে কর্মস্থলের পোশাক পরা ছবি দিয়ে লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ক্লিনার মক্কা হেরাম শরিফ।’
পরিবারের সদস্যদের সূত্রে জানা যায়, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মাহিনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানান স্বজনেরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন মাহিন। তাঁর মৃত্যুর খবর শোনার পর ওই রাতেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ফুফু আবেদা বেগম।
মাহিনের মা রহিমা বেগম জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় ছেলে প্রতি রোববার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাঁদের আগে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যম ও ফেসবুকে খবর দেখেই ছেলের মৃত্যুর কথা জানতে পারেন তাঁরা।
মাহিনের বাবা আব্দুল বাছির বলেন, সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন সংসারের হাল ধরার আশায়। ছেলে কারাগারে যাওয়ার আগে মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন। এখন একদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে সন্তান হারানোর শোক। অন্তত ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা চান তিনি।
এদিকে, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পরও পরিবারকে না জানানো এবং আইনি সহায়তার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠকেরা। তাঁরা মাহিনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারের উদ্যোগ চেয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স সোসাইটির (এইচআরডিএস) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. সুজন সরকার বলেন, ‘প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে একজন রেমিট্যান্সযোদ্ধার এমন পরিণতি দুঃখজনক। এ ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে হয়তো জীবনগুলো রক্ষা করা সম্ভব হতো।’
সামাজিক সংগঠক শামীম আহমেদ বলেন, ‘তিন বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের দুজন নাগরিক সৌদি আরবে কারাগারে ছিলেন। তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি দূতাবাস জানত না—এটা কীভাবে সম্ভব? দূতাবাসের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। পরিবারের পক্ষ থেকেও আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে এলে নিয়ম অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে।’