রাজধানীর ওয়ারীতে গত ৮ নভেম্বর চালানো এক অভিযানে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা উদ্ধারের দাবি করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে পরবর্তী অনুসন্ধান ও পুনর্তদন্তে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ, ওই অভিযানের আড়ালে এক ব্যবসায়ীর নগদ প্রায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত নথি, সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে এমন তথ্য মিলেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলমান।
যেভাবে শুরু
২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর এক সোর্সের মাধ্যমে ডিবি কর্মকর্তারা ওয়ারীর একটি বাসায় বিপুল অঙ্কের টাকা থাকার তথ্য পান। পরদিন রাতে তেজগাঁও বিভাগের তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার তারেক সেকান্দারের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি দল অভিযান চালায়।
অভিযানের আগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করা হলেও পরে সেটিকে জাল টাকার বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে দেখানো হয়।

বাসায় প্রবেশ ও তল্লাশি
রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওয়ারীর জুড়িয়াটুলির একটি ভবনের সপ্তম তলার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে ডিবি দল। ভেতরে থাকা দুই যুবককে আটক করে তল্লাশি চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি স্টিলের আলমারির ড্রয়ার থেকে কয়েক কোটি টাকার বান্ডিল উদ্ধার করা হয়, যা সবই আসল টাকা ছিল।
সোর্সের দাবি, ঘরের লাইট বন্ধ করে টাকাগুলো কয়েকটি ব্যাগে ভরে নিচে নামানো হয়। পরে আগেই সঙ্গে আনা জাল টাকা আলমারিতে রেখে প্রতিবেশীদের সামনে পুনরায় তল্লাশি দেখানো হয়। সেখান থেকে ৫–৬ লাখ জাল টাকা ও প্রায় ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা উদ্ধারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
মামলার এজাহার ও অসংগতি
৯ নভেম্বর ওয়ারী থানায় দায়ের করা মামলায় বলা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জাল নোটসহ টাকা উদ্ধার এবং দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু পুনর্তদন্তে আটক ব্যক্তিরা দাবি করেন, তাদের বৈধ নগদ ৩ কোটি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং পরে জাল টাকা সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
সিসিটিভিতে ভারী ব্যাগ নিয়ে বের হওয়ার দৃশ্য
সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে কয়েকজন ব্যক্তি কাঁধে ও হাতে ভারী ব্যাগ নিয়ে দ্রুত ভবন থেকে বের হচ্ছেন। সময়সূচি পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণে অভিযানের সময় ফোন বন্ধ বা লোকেশন অদৃশ্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
টাকার ভাগ নিয়ে অভিযোগ
সোর্সের জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে, অভিযানের পর বিভিন্ন স্থানে ডেকে টাকার অংশ দেওয়া হয়। কয়েকজনকে লাখ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ স্বীকারোক্তি দেননি।
টাকার মালিকের বক্তব্য
ওই বাসার মালিক ব্যবসায়ী মো. ফখরুদ্দীন বলেন, তিনি বৈধ স্বর্ণ ব্যবসার অর্থ বাসায় রেখেছিলেন। অভিযানের সময় তিনি বিদেশে ছিলেন। ফিরে এসে জানতে পারেন, তার কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করে জাল টাকার মামলা দেওয়া হয়েছে এবং বাসায় থাকা প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, জব্দকৃত টাকার পুরো অঙ্ক মামলায় উল্লেখ করা হয়নি এবং অর্থ ডিবি কার্যালয়ে জমাও দেওয়া হয়নি।