যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাক, বাস, ট্রেন ও নৌযানসহ বিভিন্ন যানবাহনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। কৃষি ও নির্মাণ খাতেও এই জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন বা এএএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম এখন ৫ দশমিক ৮৫ ডলারে উঠেছে। এক বছর আগে একই পরিমাণ ডিজেলের দাম ছিল গড়ে ৩ দশমিক ৭১ ডলার। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর ডিজেলের যে সর্বোচ্চ মূল্য দেখা গিয়েছিল, বর্তমান দাম সেটিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবই এর অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দেশটিতে গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ লক্ষ্যেই ভেনেজুয়েলার সঙ্গে নতুন একটি তেল চুক্তির কথা জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ডেলটা ফোরস আটক করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুমোদনে পরিচালিত একটি অভিযানের পর তাকে আটক করা হয়েছিল।
শনিবার ঘোষিত নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার প্রায় ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রমাণিতভাবে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুতের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ভাষ্য, প্রকল্পটিতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হতে পারে এবং এর মাধ্যমে ২০৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
সিবিএস নিউজকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার একটি অভিজ্ঞ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ৫৫ শতাংশ।
তবে নতুন এই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে। ভেনেজুয়েলার তেল খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে বাধাগুলো রয়েছে, নতুন উদ্যোগ সেগুলো কতটা দূর করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতিকেও দেখা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের জেরে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। ফলে এই পথের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন দেশে খুচরা জ্বালানির দামেও।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও নতুন চাপ তৈরি করছে। আগামী নভেম্বরে দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে তেল ও জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই জরিপ অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে ডিজেলের দাম এক নয়। করের পার্থক্য এবং তেল উৎপাদন কেন্দ্র থেকে দূরত্বের কারণে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে।
এর মধ্যে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ৬ দশমিক ৮১ ডলারে পৌঁছেছে। এক বছর আগে সেখানে একই পরিমাণ ডিজেলের গড় দাম ছিল ৫ দশমিক ৩ ডলার।
শুধু ডিজেল নয়, পেট্রোলের দামও যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় মূল্য ৪ দশমিক ১৫ ডলার, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ৩ দশমিক ২০ ডলার।