রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ও জুন মাসে ভুল তথ্য প্রচারের হার ছিল সবচেয়ে বেশি। দুই মাসেই ৩৪টি করে ঘটনায় ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা মোট ঘটনার ২৩ শতাংশ। এপ্রিলে ২৭টি এবং জানুয়ারিতে সবচেয়ে কম ১৫টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়।

আন্তর্জাতিক বিষয়ে ভুল তথ্য বেশি
বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গণমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি নিয়ে। এ ধরনের প্রতিবেদন শনাক্ত হয়েছে ৫৪টি। এরপর রাজনৈতিক বিষয়ে ৪১টি এবং জাতীয় ইস্যুতে ২৯টি ভুল তথ্যের ঘটনা পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া খেলাধুলায় ১০টি, ধর্ম, বিনোদন ও শিক্ষা বিষয়ে তিনটি করে, স্বাস্থ্য খাতে দুটি এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে একটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে গণমাধ্যমের ভুল তথ্য বেশি
রিউমর স্ক্যানারের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ৪৭টি আলোচিত ইস্যু ঘিরে মোট ১ হাজার ৪৬৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি ইস্যুতে গণমাধ্যমেও ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতকে কেন্দ্র করে। এই ইস্যুতে শনাক্ত ১৮০টি ভুল তথ্যের মধ্যে ২২টি গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাগুলোর মধ্যে ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গণমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি, ৯টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের ঘটনায় ৬৭ গণমাধ্যমে ভুল তথ্য
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গণমাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্যের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের একটি ঘটনা ছিল সবচেয়ে আলোচিত। গত ২৫ জুনের ওই ঘটনায় অন্তত ৬৭টি মূলধারার গণমাধ্যমে নিহত এক নারীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রিউমর স্ক্যানারের যাচাই অনুযায়ী, তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং এইচএসসি পাস করলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি।
রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরাও ভুল তথ্যের লক্ষ্যবস্তু
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি, এর অঙ্গসংগঠন ও নেতাকর্মীদের ঘিরে সবচেয়ে বেশি ২২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর ৫০ শতাংশ ছিল ইতিবাচক বয়ানের। আওয়ামী লীগকে ঘিরে ৮টি ভুল তথ্যের ৮৭ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ৫টির ৬০ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিকে নিয়ে ৩টির ৬৭ শতাংশ ছিল ইতিবাচক।

ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে। তাকে ঘিরে ৮টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার ৮৭ শতাংশ ইতিবাচক বয়ানের। এ ছাড়া শামীম ওসমানকে নিয়ে ৩টি ভুল তথ্যের সবগুলোই ইতিবাচক ছিল।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে দুটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, দুটিই নেতিবাচক। হাসনাত আবদুল্লাহকে নিয়ে দুটি ভুল তথ্যের দুটিই ইতিবাচক এবং ফজলুর রহমানকে নিয়ে দুটি ভুল তথ্যের দুটিই নেতিবাচক ছিল। জুবাইদা রহমান ও জাইমা রহমানকে নিয়েও দুটি করে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো সবই ইতিবাচক বয়ানের।
ভুল তথ্য প্রচারে শীর্ষে ইনকিলাব
গণমাধ্যমভিত্তিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচারের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দৈনিক ইনকিলাব। পত্রিকাটির ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম বিশ্লেষণ করে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২১টি ভুল সংবাদ শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
এসবের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিষয়ে ৯টি, জাতীয় ইস্যুতে ৭টি, রাজনৈতিক বিষয়ে ৪টি এবং ধর্মীয় বিষয়ে একটি ভুল তথ্য ছিল। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচটি প্রতিবেদনে পুরোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তিনটি ক্ষেত্রে সাজানো বা স্ক্রিপ্টেড ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া ছয়টি প্রতিবেদনে এআই-নির্মিত কনটেন্টকে বাস্তব হিসেবে প্রচার এবং অন্তত দুটি ভিডিওতে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় ও বিদেশি গণমাধ্যমেও ভুল তথ্য
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও ভুল তথ্যের নজির পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) একটি করে প্রতিবেদনে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
বিদেশি গণমাধ্যমের বাংলা সংস্করণও এই তালিকার বাইরে নয়। প্রথম ছয় মাসে বিবিসি বাংলা ও ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগে একটি করে ভুল তথ্যসম্বলিত প্রতিবেদন শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
পুরোনো ভিডিও ও এআই কনটেন্ট বড় উৎস
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভুল তথ্যের উৎস বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে প্রচারের প্রবণতা। এ ধরনের ৩২টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এরপর এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টকে কেন্দ্র করে ২৭টি ভুল তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ভুয়া মন্তব্যের ভিত্তিতে ৯টি, সাজানো বা স্ক্রিপ্টেড ঘটনার ৭টি, ভুয়া পেজ বা প্রোফাইলের তথ্য থেকে ৫টি এবং সার্কাজম পেজের কনটেন্টকে সত্য হিসেবে প্রকাশের ৪টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো ছবি ও সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের ৪টি করে, ডিপফেকের ২টি এবং পুরোনো বক্তব্যকে সাম্প্রতিক দাবি হিসেবে প্রচারের ২টি ঘটনাও পাওয়া গেছে।
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণ বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া কনটেন্ট যথাযথভাবে যাচাই না করে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা গণমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম বড় কারণ।
সূত্র: রিউমর স্ক্যানার