সপ্তাহান্তে মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বৈঠকে হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানায়, ২০২৫ সালে হওয়া যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং লোহিত সাগরে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলার পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজকে তারা লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে বলে জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের সামনে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা কিংবা পাকিস্তান ও তুরস্কসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। গত সপ্তাহে দ্রুতগতির অভিযানে হুথিরা পশ্চিম ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়।
হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি সোমবার নিশ্চিত করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কর্মকর্তারা হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।
ইয়েমেনে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপ-রাষ্ট্রদূত নাবিল খৌরি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ও হুথিদের মধ্যে এক ধরনের নীরব সমঝোতা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বাধা না দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে; তবে সৌদি জাহাজ ও সৌদি তেল বহনকারী জাহাজ ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
এদিকে সৌদি আরব মঙ্গলবার দাবি করে, হুথিরা পবিত্র নগরী মক্কার দিকে একটি ড্রোন পাঠিয়েছিল। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটের দিকে ড্রোনটি প্রতিহত করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি মক্কার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার চেষ্টা করছিল।
সৌদি আরব মক্কায় হামলাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এডেনভিত্তিক জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও ৫৭ দেশের সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও কথিত হামলার নিন্দা করেছেন।
তবে সৌদি আরবের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হুথিরা। তাদের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল ওয়াহিদ আবু রাস এটিকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা’ বলে আখ্যা দেন।
অন্যদিকে হুথিরা দাবি করেছে, মারিবের কাছে তারা একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে এবং ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব দাবির পক্ষে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র কোনো প্রমাণ দেননি। হুথিদের আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ আবদুল সালাম বলেন, যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের ঘটনা পশ্চিমাদের জন্য সতর্কবার্তা।
হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ বলেন, ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব এখন বাইরের সহায়তা খুঁজছে এবং বাব আল-মান্দাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
এদিকে জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের সামরিক কমান্ডারদের একটি গোপন বৈঠকের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। অ্যাক্সিওসের সাংবাদিক বারাক রাভিদের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ওই বৈঠকের আয়োজন করেন। এতে ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও মিসরের সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মঙ্গলবারের বৈঠকে লোহিত সাগর বন্ধের যেকোনো প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো হয়। একই সময়ে বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বৈঠকটি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ুক, তারা তা চায় না। পাশাপাশি জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতার ভিত্তিতে ওয়াশিংটনকে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনও বোমা হামলার পর এখনো বন্ধ রয়েছে।