নিখোঁজদের উদ্ধারে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। এর মধ্যেই নতুন বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাদা ও পাথরের স্তূপে ভটকোশী নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে সেখানে একটি কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। যেকোনো সময় সেটি ভেঙে পড়লে নতুন করে বড় ধরনের বন্যা ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
গত বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে তিব্বত এলাকায় একটি হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত হিমালয়ের নদীগুলোতে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে এর প্রভাবে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসার যোগাযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও নদীতীরবর্তী বহু গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্যোগের ভয়াবহতা বর্ণনা করে স্থানীয় বাসিন্দা জনক বাহাদুর বলেন, নদী দূর থেকে শান্ত মনে হলেও মুহূর্তের মধ্যে পানি বেড়ে গিয়ে সবকিছু ভাসিয়ে নেয়। তাঁর ভাষায়, ঘটনাটি ছিল যেন হঠাৎ বিশাল কোনো বিস্ফোরণ।
হেলিকপ্টারে উদ্ধার হওয়া রসুল এলাকার বাসিন্দা ডিবগা তামাং কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, তাঁদের সব শেষ হয়ে গেছে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের অনেকেই মারা গেছেন। তাঁর জন্য অপেক্ষা করার মতোও আর কেউ নেই।
তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অঞ্চলের গ্যিরোং কাউন্টিও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র গ্যিরোং পোর্টের অবকাঠামো ও বহু যানবাহনও প্রবল স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগ পরিস্থিতি পরিদর্শনে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে ঘটনাস্থলে যান চীনের প্রিমিয়ার লি ছিয়াং। বেইজিং এই দুর্যোগ মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে।
নিখোঁজ বিদেশিদের নিয়ে উদ্বেগ
নিখোঁজদের তালিকায় ভারত, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রায় দুই ডজন দেশের নাগরিক রয়েছেন। স্বজনদের সন্ধানে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।
দুর্যোগে গভীর শোক প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারতের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে।
নতুন প্লাবনের আশঙ্কা
উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেই ভটকোশী নদীতে সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভূমিধসের কাদা ও পাথরে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে পানি জমে হ্রদটির সৃষ্টি হয়েছে।
চীনা সরকারের তথ্যমতে, সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে, যা প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে হ্রদটির পানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। বাঁধ ভেঙে গেলে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে ভয়াবহ প্লাবন দেখা দিতে পারে।
উদ্ধারকাজ অব্যাহত
নেপালের চিতওয়ান জেলার পুলিশ জানিয়েছে, মূল দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভাটিতে নদী থেকে শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে মরদেহের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করে শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
দুর্গত এলাকা পরিদর্শনের পর নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারের সব সংস্থা সর্বশক্তি নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমেছে। জীবিতদের উদ্ধার, নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গতদের কাছে প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছানোই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১৫ সালের ৮ দশমিক ১ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্পের সময়ের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সূত্র: রয়টার্স।