বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ফটোকার্ডে পরিচিত সংবাদমাধ্যমের লোগো, রং, ফন্ট ও নকশা হুবহু নকল করা হয়। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই এগুলোকে সত্যিকারের সংবাদ ভেবে গ্রহণ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল এলোমেলো জালিয়াতি নয়—বরং সুপরিকল্পিতভাবে জনমত প্রভাবিত করার একটি পদ্ধতি, যেখানে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এই প্রবণতা বাড়তে শুরু করে এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে তা আরও তীব্র হয়। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে এসব ভুয়া ফটোকার্ড। একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট সময়ে ছড়ানো মোট রাজনৈতিক অপতথ্যের প্রায় অর্ধেকই এসেছে এই মাধ্যম থেকে।
ছয় মাসে বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং সংস্থার ৫৩৮টি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে অন্তত ৬৯০টি ভুয়া ফটোকার্ড শনাক্ত করা হয়েছে। এর অনেকগুলোই পরিচিত সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি। এসব কার্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করা, নিজেদের পক্ষে অতিরঞ্জিত দাবি তুলে ধরা কিংবা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতারাও এই অপতথ্যের বড় লক্ষ্যবস্তু। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব অপতথ্য কুরুচিপূর্ণ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ রূপও নিয়েছে, বিশেষ করে নারী নেত্রীদের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দিতেও এসব ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করা হয়েছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। কারণ, যখন মানুষ কোনো পরিচিত সংবাদমাধ্যমের নাম দেখে একটি তথ্য বিশ্বাস করে এবং পরে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তখন সেই অবিশ্বাসের বোঝা গিয়ে পড়ে প্রকৃত সংবাদমাধ্যমের ওপরই।
ভুয়া ফটোকার্ড তৈরির ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো মূলত দুইভাবে তৈরি হয়। একদিকে সংবাদের মতো করে বানানো কার্ড, যেখানে গ্রেপ্তার, অপরাধ বা জনমত জরিপের ভুয়া তথ্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামে বানোয়াট উদ্ধৃতি বা বক্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এসব কার্ডের বিস্তার সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। বড় কোনো ঘটনা ঘটলেই সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে নতুন নতুন ভুয়া ফটোকার্ড। যেমন, সহিংস ঘটনা, রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন বা জোটভাঙার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে ঘিরে অপতথ্যের ঢল নামে।
বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, প্রায় ৬২ শতাংশ ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক আক্রমণের উদ্দেশ্যে। প্রায় ১৬ শতাংশ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এবং ১২ শতাংশের কিছু বেশি ইতিবাচক প্রচারণার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের ভিজ্যুয়াল পরিচয় নকল করার ক্ষেত্রেও কিছু নির্দিষ্ট নাম বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা নিজেদের সুবিধামতো ভিন্ন ভিন্ন সংবাদমাধ্যমের আদলে কার্ড তৈরি ও প্রচার করেছে।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। বিএনপিকেও ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও অপতথ্যের বিস্তার উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ছাত্রনেতা ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও এই প্রচারণার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে নারীদের লক্ষ্য করে ছড়ানো অপতথ্যে কুরুচিপূর্ণ ভাষা, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ এবং সহিংসতার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভুয়া ফটোকার্ড এখন কেবল অনলাইন বিভ্রান্তির একটি উপাদান নয়—এটি রাজনৈতিক প্রচারণার একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; সমাজে অবিশ্বাস, বিভাজন এবং উত্তেজনা বাড়াতেও এটি বড় ভূমিকা রাখছে।
সূত্র: ডিসম্যাসল্যাব