দলীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে গেলে মহাসচিবের দায়িত্বে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির অতীত সাংগঠনিক রীতিতে প্রথম যুগ্ম মহাসচিবকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার নজির থাকায় এবারও সে ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
এই সম্ভাবনার জায়গা থেকেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম। দীর্ঘ সময় ধরে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকায় জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে বলে মনে করেন দলের অনেক নেতা। সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়েও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় রিজভীকে নিয়মিত সক্রিয় দেখা গেছে। সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দলের বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় বিভিন্ন সময়ে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি সমন্বয় করেছেন।
তবে সম্ভাব্য তালিকায় শুধু রিজভীই নন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও আলোচনায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুমের শিকার হওয়ার পর দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থান করলেও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সালাহউদ্দিন বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও রয়েছেন।
তবে দলের একটি অংশ মনে করে, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকায় তৃণমূলের সঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদের সরাসরি যোগাযোগ তুলনামূলক কম। মহাসচিবের মতো সাংগঠনিক পদে এটি বিবেচনায় আসতে পারে বলে তাদের ধারণা।
এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।
বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় সংগঠন শক্তিশালী রাখার বিষয়টিকে এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে দলের চেয়ারম্যান থাকায় মাঠের সাংগঠনিক কার্যক্রমে মহাসচিবের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে এমন নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে মত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য এশিয়া পোস্টকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ মহাসচিবের নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে। তৃণমূলের সঙ্গে যার যোগাযোগ দুর্বল, তাকে এই দায়িত্ব দিলে তা দলের জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও কর্মীবান্ধব নেতৃত্বের দাবি রয়েছে। কুমিল্লা বিভাগের বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকেই অভিজ্ঞ ও দক্ষ কাউকে মহাসচিব হিসেবে দেখতে চান তারা।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশও তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা নেতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, আন্দোলনের সময় যারা কর্মীদের পাশে ছিলেন এবং তাঁদের সাহস দিয়েছেন, মহাসচিব নির্বাচনে তাঁদের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, মহাসচিব নির্বাচনের বিষয়টি দলের জন্য কোন সিদ্ধান্ত সবচেয়ে ভালো হবে তার ওপর নির্ভর করবে। তাঁর ভাষ্য, ত্যাগী, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ নেতাদের মধ্য থেকেই কাউকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মির্জা ফখরুল আর মহাসচিব পদে থাকতে চান না—এমন কথাও তাঁরা শুনেছেন বলে জানান তিনি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর মতে, দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারবেন এবং দল ও দেশের জন্য কার্যকর হবেন—এমন নেতাই মহাসচিব হওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন। তুলনামূলক তরুণ কাউকেও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন বিরোধী দল থেকে সরকার পরিচালনার পর্যায়ে আসায় দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও সরকারের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় রাখা নতুন মহাসচিবের অন্যতম বড় দায়িত্ব হবে। বিশেষ করে তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ ধরে রাখা এবং দলের সাংগঠনিক গতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে নতুন মহাসচিবকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
এই বিবেচনায় দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় দপ্তর ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা রুহুল কবির রিজভী সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন বলে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলীয় কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে।