সংঘাত শুরুর পর তেলের দাম ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা করা হলেও এখনো তা হয়নি। তবে যুদ্ধ সাত মাসে গড়ালেও শেষ হওয়ার স্পষ্ট কোনো লক্ষণ নেই। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এতদিন যেসব ব্যবস্থা কাজে এসেছে, সেগুলোর সক্ষমতাও দ্রুত কমে আসছে বলে জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা মনে করছেন।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ কমলেও পারস্য উপসাগর থেকে বিকল্প পথে কিছু তেল রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে আবকাইক থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু পর্যন্ত তেল পরিবহন করছে। পাইপলাইনটির দৈনিক সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল হলেও সাধারণ সময়ে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হয়।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হুতিদের হামলার পর পাইপলাইনটির সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। পরে সীমিত পরিসরে চালু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ লাগতে পারে। এতে আগে থেকেই সংকুচিত বাজারে সরবরাহের চাপ আরও বেড়েছে। লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজে নতুন হামলার আশঙ্কাও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির ডিজেল উৎপাদন কমেছে। এর ফলে রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করেছে। বিশ্ববাজারে প্রতিদিনের ডিজেল সরবরাহও প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। পরিবহন ও পণ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক পণ্যমূল্যেও।
যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২২ সেপ্টেম্বর দেশটির ৪৭টি রাজ্যে ডিজেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে এবং জাতীয় গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ৫২ ডলারে দাঁড়ায়। পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নিলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ আরও কমে গিয়ে দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
পারস্য উপসাগরীয় তেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো সংকটের বড় ধাক্কা সামলাচ্ছে। কয়েকটি দেশে জ্বালানি রেশনিং করা হয়েছে। কোথাও জ্বালানি সাশ্রয়ে কর্মসপ্তাহ ও স্কুলসপ্তাহ কমানোর মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ইউরোপেও সংকটের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ২০ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের প্রায় ১৫ শতাংশ সার্ভিস স্টেশনে ডিজেল বা গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।
তেলের সরবরাহ বাড়ানো ও চাহিদা কমাতে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলো এখন পর্যন্ত শুধু দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমাতে পেরেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় একটি উদ্যোগ ছিল বিভিন্ন দেশের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত।
২০২৬ সালের মার্চে ৩২টি দেশ মিলে কৌশলগত মজুত থেকে ৪০ কোটির বেশি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ে। তবে এসব মজুতও এখন অনেকটাই কমে গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দেশগুলো নতুন করে কতটা তেল ছাড়তে পারবে বা আদৌ আগ্রহী হবে কি না, তা অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র একাই যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ১৩ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। এতে দেশটির মজুত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
এ পরিস্থিতিতে চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশটি অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়েছে। অর্থনীতিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ায় তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও সৌর প্যানেলের ব্যবহার বাড়ায় অন্যান্য দেশও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় চীনা প্রযুক্তি ও পণ্যের দিকে ঝুঁকছে।
তবে চীনের তেলের চাহিদা আবার বাড়তে শুরু করেছে। আগস্টে দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানি আগের মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধের আগের পর্যায়ে আমদানি না ফিরলেও চাহিদা বাড়ার এই প্রবণতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট আগামী কয়েক সপ্তাহে তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।