ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শিগগিরই তার নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় গাজা উপত্যকা সম্পূর্ণভাবে পুনর্দখলের প্রস্তাব দিতে পারেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম। স্থানীয় এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, “সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। এবার আমরা গাজা দখল ও হামাসকে সম্পূর্ণ পরাজিত করতে যাচ্ছি।”
নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাই তার কাছে অগ্রাধিকার, তবে গাজা দখলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইসরায়েলের ওপরই ছেড়ে দেবেন।
এদিকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতারা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। প্রতিরক্ষা প্রধানের বিরোধিতার প্রসঙ্গে ওই কর্মকর্তা বলেন, “যদি তিনি এটি মেনে নিতে না পারেন, তবে তার পদত্যাগ করা উচিত।”
গাজায় বন্দি থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের পরিবার এই পরিকল্পনায় তাদের প্রিয়জনদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ধারণা করা হচ্ছে, এখনও প্রায় ২০ জন জীবিত জিম্মি রয়েছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক যুদ্ধবিরতির পক্ষে, যাতে জিম্মি বিনিময়ের চুক্তি সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা: নেতানিয়াহুর এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াবে।
ইসরায়েলের শত শত অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা—যাদের মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানরাও আছেন—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে নেতানিয়াহুর ওপর যুদ্ধ বন্ধে চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। সাবেক গোয়েন্দা প্রধান আমি আয়ালোন বলেন, “সামরিক দিক থেকে হামাস ধ্বংস হলেও আদর্শিকভাবে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। একমাত্র সমাধান হচ্ছে—ভালো ভবিষ্যতের প্রস্তাব দেওয়া।”
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে গাজার প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তবে সম্পূর্ণ দখলের পরিকল্পনায় দুই মিলিয়নেরও বেশি ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীভূত এলাকায় আটকে পড়বে। জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, এই পরিকল্পনায় মানবিক বিপর্যয় আরও বাড়বে।
ইসরায়েল কিছুটা চাপ কমাতে গাজায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে শিশু খাদ্য, ফলমূল, শাকসবজি এবং ওষুধ সরবরাহের অনুমতি দিয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ইসরায়েল এখনো জরুরি ত্রাণ পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে।
গাজার ৯০ শতাংশ মানুষ ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং চরম সংকটপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছেন, গাজা পুনর্দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেখানে নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন করা হবে।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরা গাজা দখলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নেতানিয়াহুর আসল উদ্দেশ্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা। ইয়েদিওথ আহরনোথ পত্রিকার বিশ্লেষক নাহুম বারনিয়া লিখেছেন, “নেতানিয়াহু এর আগে কখনো এত বড় ঝুঁকি নেননি। যুদ্ধের ২২ মাস পর তার প্রতিশ্রুতিগুলো আর বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।”
নেতানিয়াহুর আহ্বানে শিগগিরই নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজার শরণার্থী ক্যাম্প ঘিরে ফেলা, বিমান হামলা এবং স্থল অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। সেই হামলায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে, হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে প্রায় ৬১ হাজার ২০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।