প্রধানমন্ত্রীর সাবেক রাজনৈতিক সহকারী ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা রাশেদ খান এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীর ব্যবহৃত গাড়িটির মালিক মনিরুল ইসলাম তুষার ভুঁইয়া এবং তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তার পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী আগে আওয়ামী লীগের বাড়িঘর ও সম্পদ দখলের কথা বলতেন। আওয়ামী লীগ নেতার গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং গাড়িটি কীভাবে পাটওয়ারীর ব্যবহারে এসেছে, তা তদন্তের দাবি জানান।
একই পোস্টে রাশেদ খান দাবি করেন, বিরোধী দলের ছয় দফা দাবিতে আয়োজিত আগের দিনের লংমার্চে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কিংবা গণহত্যার বিচারের দাবিতে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ওই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে ডিসেম্বরে দেশে ফেরানোর প্রেক্ষাপট তৈরি করা।
পোস্টে উস্কানিমূলক স্লোগান এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়। পাশাপাশি এ ঘটনায় এনসিপি দলীয়ভাবে কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না, তা দেখার কথাও বলেন তিনি।
শুধু রাশেদ খান নন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা পেপার্সও ‘আওয়ামী লীগের নেতার গাড়ি নিয়ে ঘুরছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী?’ শিরোনামসংবলিত একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে। এতে মোহাম্মদ সাফায়েত হোসেন নামে একজন অ্যাক্টিভিস্টের একই ধরনের বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের ফোরাম Bangladesh Centrist Activists Network-এর ফ্যাক্ট-চেক অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা ট্র্যাকিং ডিরেক্টর Md M Rashed ফেসবুকে একই ধরনের দাবি করেন। প্রায় একই বক্তব্য কয়েকটি বিএনপিপন্থী ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। BCAN নিউজেও এ সংক্রান্ত একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে গাড়িটির মালিক হিসেবে মনিরুল হক ভুঁইয়া ওরফে তুষার ভুঁইয়ার নাম পাওয়া গেছে। তাকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে উল্লেখ করার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
বরং পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তুষার ভুঁইয়া ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাদারীপুর সদর থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২৪ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্তও তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।
তুষার ভুঁইয়ার পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ও বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম, যিনি বাচ্চু ভুঁইয়া নামেও পরিচিত, ১৯৮৮ সালে মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি মাদারীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেছেন।
দ্য ডিসেন্টের হাতে আসা বিভিন্ন ছবি ও অন্যান্য তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে তুষার ভুঁইয়াকে বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেও দেখা গেছে।
এ ছাড়া তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের সময় তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট করেছিলেন।
মনিরুল হক ভুঁইয়া দ্য ডিসেন্টকে বলেন, তাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়।
তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়েছেন এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে আওয়ামী লীগ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টাকে তিনি হাস্যকর বলেও মন্তব্য করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তার বিভিন্ন ছবি থাকার বিষয়ে তুষার ভুঁইয়া বলেন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে তৎকালীন মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে ছবি তুলতে হয়েছে। দায়িত্বের অংশ হিসেবে তোলা এসব ছবি ব্যবহার করে তাকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে এনসিপির মাদারীপুর জেলার যুগ্ম সমন্বয়ক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাদারীপুর জেলার সাবেক আহ্বায়ক মো. নিয়ামত উল্লাহও জানিয়েছেন, তুষার ভুঁইয়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের শুরু থেকেই তুষার ভুঁইয়া তাদের সমর্থন ও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছেন। এমনকি আর্থিক সহযোগিতাও করেছেন বলে দাবি করেন নিয়ামত উল্লাহ। তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সেটি সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সূত্র: দ্যা ডিসেন্ট