আজ মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টায় আয়োজিত এই আনুষ্ঠানিকতায় উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী সংগঠন এবং ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিরা। ড. ইউনূস এই ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, অতীত সরকারের ব্যর্থতা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরেন।
ঘোষণাপত্রে জাতির অতীত সংগ্রামের পটভূমি তুলে ধরে বলা হয়, উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে এসেছে। তবে স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের সংবিধানের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ক্ষমতাসীনদের একদলীয় শাসনের প্রবণতা গণতন্ত্রকে বারবার বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়।
ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা, ১/১১-এর ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ ষোল বছর ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনের আড়ালে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিস্তার নিয়ে। এতে বলা হয়, বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা, সীমাহীন দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে জনগণ এক দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করে আসছিল। ছাত্রদের আহ্বানে শুরু হওয়া এ গণআন্দোলন ধীরে ধীরে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
ড. ইউনূস বলেন, এই অভ্যুত্থানে সামরিক বাহিনীর একটি অংশ জনগণের আন্দোলনকে সমর্থন জানায় এবং শেষপর্যায়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের মাধ্যমে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা ও অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নিহতদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে তাঁদের পরিবার এবং আহতদের জন্য আইনি ও মানবিক সুরক্ষার নিশ্চয়তাও দেওয়া হবে।
ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের আহ্বান এসেছে, তার ভিত্তিতে ফ্যাসিবাদ ও বৈষম্যবিরোধী নতুন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্গঠন করা হবে। প্রশাসন পরিচালনায় দুর্নীতিমুক্ত নীতিমালা গ্রহণ করে জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
এ ছাড়া ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও জলবায়ুর সুরক্ষায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
ঘোষণাপত্রের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’কে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে এবং ভবিষ্যতে গঠিত সংসদে এই ঘোষণাপত্রকে সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
ঘোষণাপত্র পাঠ শেষে ড. ইউনূস বলেন, “এই ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের জনগণের আত্মত্যাগ, আশাভরসা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। এখন সময়, নতুন এক বাংলাদেশ গঠনের পথে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার।”
অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত হাজারো মানুষ ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগানে মুখর করে তোলে দক্ষিণ প্লাজা চত্বর—“ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”—এই কণ্ঠধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় পুরো এলাকায়।